চলনবিল অঞ্চলে বছরের পর বছর চলছে পাখি নিধন




তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ)প্র‌তি‌নি‌ধিঃ চলনবিলের দুর্গম অঞ্চলে নির্বিকারে চলছে পাখি নিধন। রাতের বেলায় বিশেষ ধরনের জাল পেতে নানা প্রজাতির পাখি নিধন করে সকালে গ্রামাঞ্চলে ফেরী করে বিক্রি হচ্ছে সে পাখি।

আর পাখি নিয়ে কাজ করা কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কিছু পাখি উদ্ধার করে অবমুক্ত করলেও স্থায়ীভাবে এখনও চলনবিলঞ্চলে পাখি নিধন ও বিক্রি বন্ধ হয়নি।

এ দিকে ২৪ অক্টোবর (মঙ্গলবার) পরিবেশ উন্নয়ন ও প্রকৃতি সংরক্ষণ ফোরামের সদস্য সাংবাদিক জুলহাস কায়েমের নেতৃতে সিংড়া উপজেলার ডাহিয়া ইউনিয়নের ক্ষিরপোতা গ্রামে অভিযান পরিচালনা করে তিনটি বাঁশের কেল্লা ধ্বংস করে ১৫ টি বক উদ্ধার করা হয়। পরে সিংড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আল ইমরানের সহযোগিতায় ১৫ টি বক অবমুক্ত করেছেন ওই সংগঠনটি।
চলনবিল অঞ্চলে পাখিসহ জীবও বৈচিত্র্য রক্ষায় চলনবিল অধ্যুষিত নাটোরের সিংড়া, গুরুদাসপুর ও তাড়াশ উপজেলা এলাকায় পাখি শিকার বন্ধে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গুলোর তথ্য চিত্র দেখলে বোঝা যায় চলনবিল এলাকায় প্রতি বছর বিপুল সংখক পাখি শিকার হয়।


‘চলনবিল জীবও বৈচিত্র্য রক্ষা কমিটি’ নামের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল ইসলাম জানান, তাঁদের স্বেচ্ছাসেবীরা ২০২০ সালে ৩০ জন পাখি শিকারীর কাছ থেকে পাখি শিকার না করার মুচলিকা নেন। এ সময় তাঁরা বক, ঘুঘু, শ্যামকৈলসহ বিভিন্ন প্রকার শিকার করা ৬০০ পাখি অবমুক্ত করেন। ২০২১ সালে ৫০ জন পাখি শিকারীর কাছ থেকে মুচলিকা নেন। পাশাপাশি শিকার করা প্রায় এক হাজার ২০০ মতো পাখি অবমুক্ত করেন। সংগঠনটির স্বেচ্ছাসেবীরা এ বছর প্রশাসনের সহযোগিতা ২১টি ভ্রাম্যমান আদালতে ৩০ জনের মতো পাখি শিকারিকে জরিমানা আদায় করেন। ২০২২ সালে সংগঠনটি ২০ জন পাখি শিকারীর কাছ থেকে মুচলিকা নেন। আর ৯ মাসে এক হাজার শিকার করা পাখি অবমুক্ত করেন ও ৩ টি ভ্রাম্যমান আদালতে প্রায় ১০ জন শিকারী আর্থিক জরিমানা আদায়ের ব্যবস্থা করেন। অবশ্য তিনি দাবী করেন, তাঁরা গত ১০ বছরে চলনবিল এলাকায় শিকার করা প্রায় ৩৫-৪০ হাজার পাখি অবমুক্ত করেছেন।


জীবও বৈচিত্র্য রক্ষায় চলনবিল অঞ্চলে কাজ করেন আরেকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন স্বাধীন জীবন। স্বাধীন জীবনের নির্বাহী পরিচালক মো. আব্দুর রাজ্জাক নাসিম জানান, এ সংগঠনটি ২০২০ সালে প্রায় ৫০০, ২০২১ সালে ৫৩০টি ও ২০২২ সালের ৯ মাসে প্রায় ৬০০ টির মতো শিকারীদের শিকার করা পাখি উদ্ধার করে অবমুক্ত করেছেন।


এ ছাড়াও চলনবিল এলাকায় কাজ করেন এমন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন দি বার্ডাস সেফটি হাউজের চেয়ারম্যান মামুন বিশ্বাস বলেন, চলনবিল অঞ্চলে স্বেচ্ছাসেবী কিছু সংগঠন পাখি রক্ষায় কাজ করছেন। তাঁরা শিকার করা পাখি অবমুক্ত করলেও তৃণমূল পর্যায়ে জনসচেতনার অভাব ও সরকারী-বেসরকারী সম্বন্বতি উদ্দেগের অভাবে চলনবিল অঞ্চলে স্থায়ীভাবে পাখি শিকার বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না।


এখন চলনবিল অঞ্চলে বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে শুরু হয়েছে নির্বিচারে বিভিন্ন ধরনের পাখি নিধন। শিকারীর হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না বক থেকে শুরু করে ভাড়ই, রাতচোড়া, টোগা, বালিহাঁস, পানকৈড়, পারিযাতসহ দেশীয় প্রজাতির অনেকে পাখি। আর বর্তমানে চলনবিলের বিভিন্ন গ্রামে প্রতি এক জোড়া ভাড়ই বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১১০ টাকা, প্রতি জোড়া বালিহাঁস ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা, টোগা প্রতি জোড়া ৯০ থেকে ১১০ টাকা, রাত চোরা ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা প্রতি জোড়া, বক প্রতি জোড়া ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।


চলনবিলাঞ্চলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষকারী পাখি নিধন প্রসঙ্গে রাজশাহী বিশ্ব বিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম বলেন, বন্যপ্রাণী আইন অনুযায়ী পাখি নিধন দন্ডনীয় অপরাধ। আর শীত মৌসুম বা বর্ষার শেষে শরৎকালে খাদ্য ও নিরাপত্তার জন্য দেশীয় ও অতিথি পাখি চলনবিল এলাকায় এসে থাকে। এ সব পাখি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, সৌন্দর্য বর্ধন এবং এদের বিষ্ঠায় স্বল্প পরিমানে জৈব সারের কাজ করার পাশাপাশি ক্ষতিকারক পোকামাকড় খেয়ে পরিবেশকে রক্ষা করে।


এ প্রসঙ্গে রাজশাহী বন্যপ্রাণী ব্যাবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আহম্মেদ নিয়ামুর রহমান বলেন, বন বিভাগে জনবল সংকট অনেক বেশী। বিশেষ করে ১৬ জেলায় মাঠ পর্যায়ে (উপজেলা এলাকায়) জনবলের অভাবে সঠিকভাবে কাজ করতে পারছি না। তবে আমরা পাখি শিকারের খবর পেলে সেখানে অভিযান পরিচালনা করে পাখি শিকার বন্ধের চেষ্টা করছি।

Share This Article On:

মন্তব্য করুন
Submit Comment

Privacy Policy মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url